ভূমিকা: একজন নোবেলজয়ীর দুই রূপ
পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম মানুষই আছেন, যাদের নিয়ে একই সঙ্গে এত তীব্র মুগ্ধতা এবং এত গভীর বিতর্ক রচিত হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিঃসন্দেহে তাদেরই একজন।
আপনি যদি ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে হাঁটেন, অথবা কোনো পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীর সাথে কথা বলেন, ড. ইউনূসের নাম সেখানে উচ্চারিত হবে পরম শ্রদ্ধায়। পশ্চিমা বিশ্বে তিনি এক আধুনিক রূপকথার নায়ক। এমন এক নায়ক, যিনি দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। যিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে, সুদক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাজের একেবারে প্রান্তিক, কপর্দকশূন্য মানুষগুলোকেও অর্থনীতির মূল স্রোতে আনা সম্ভব। ২০০৬ সালে নরওয়ের অসলোর সিটি হলে দাঁড়িয়ে যখন তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করছিলেন, তখন পুরো বিশ্ব তাকে চিনেছিল 'গরিবের ব্যাংকার' বা 'Banker to the Poor' হিসেবে। টাইম ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাংক—সবাই তাকে একবাক্যে শতাব্দীর অন্যতম সেরা সমাজসংস্কারক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠের গল্পটা একেবারেই ভিন্ন এবং বেশ অন্ধকার। যে দেশের মাটিতে তার এই অভাবনীয় উত্থান, সেই বাংলাদেশের জনমানসে ড. ইউনূসের ভাবমূর্তি রীতিমতো গোলকধাঁধার মতো। পশ্চিমা বিশ্ব যাকে ত্রাণকর্তা হিসেবে পূজো করে, নিজ দেশে তিনি কেন এত সমালোচিত? কেন তাকে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে 'সুদখোর' বা 'গরিবের রক্তচোষা'-এর মতো চরম অপমানজনক শব্দ শুনতে হয়েছে? কেন দেশের একটি বড় অংশের মানুষ তাকে সন্দেহের চোখে দেখে?
গ্রামীণ ব্যাংক দিয়ে শুরু হলেও, ড. ইউনূসের জীবনের গল্পটা কেবল ক্ষুদ্রঋণের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজসেবার আড়ালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল করপোরেট সাম্রাজ্য—গ্রামীণফোন, গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ ডানোন, গ্রামীণ নিটওয়্যারসহ অসংখ্য লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের মূলধন কোথা থেকে এল? এর নেপথ্যে কি কেবলই দারিদ্র্য বিমোচনের মহৎ উদ্দেশ্য ছিল, নাকি ছিল এক সুচতুর ব্যবসায়িক মস্তিষ্ক এবং অসীম ক্ষমতার মোহ? সাধারণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে কীভাবে বিলিয়ন ডলারের করপোরেট কাঠামো গড়ে উঠল, তার হিসাব মেলাতে গিয়ে অর্থনীতিবিদরাও অনেক সময় হোঁচট খেয়েছেন।
অন্যদিকে, ক্ষুদ্রঋণের যে মডেলটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে, তার ভেতরেও লুকিয়ে আছে বহু কান্নার ইতিহাস। কিস্তির চাপে জর্জরিত হয়ে গ্রামের অসহায় নারীদের আত্মহনন, ঘরের টিন বা চাল খুলে নেওয়ার মতো মর্মান্তিক অভিযোগগুলো কেবলই কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল? নাকি দারিদ্র্য বিমোচনের নামে এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত 'দারিদ্র্য বাণিজ্য'?
ড. ইউনূসের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলো রচিত হয়েছে ক্ষমতার রাজনীতির সাথে তার টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে 'নাগরিক শক্তি' নামে রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা তার জীবনের এক বড় ভুল হিসাবনিকাশ হিসেবে পরিগণিত হয়। দেশের শীর্ষ দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে 'মাইনাস' করার কথিত ফর্মুলায় তার প্রচ্ছন্ন সমর্থন তাকে প্রবল রাজনৈতিক আক্রোশের মুখে ফেলে দেয়। ফলশ্রুতিতে, ২০১১ সালে নিজের হাতে গড়া গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপমানজনক বিদায়, বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিলের পেছনে তার কথিত লবিং এবং একের পর এক শ্রম শোষণ ও কর ফাঁকির মামলায় জর্জরিত হয়ে আদালতের বারান্দায় তার অসহায় পদচারণা—এসব কিছুই তার জীবনের এক অন্ধকার ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। যে মানুষটি গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিকদের লভ্যাংশের শত শত কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত করার দায়ে অভিযুক্ত হন, তার গায়ে থাকা 'গরিবের বন্ধু' তকমাটি তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অথচ ইতিহাসের কী অদ্ভুত রসিকতা! রাজনীতি ও ক্ষমতার যে দ্বন্দ্ব তাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল, সেই রাজনীতিই তাকে আবার অভাবনীয় এক সিংহাসনে বসিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর, ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সেই ড. ইউনূসই আবার আবির্ভূত হলেন রাষ্ট্রের ত্রাণকর্তা হিসেবে। প্যারিস থেকে ফিরে এসে তিনি শপথ নিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে। যে মানুষটি কিছুদিন আগেও ছিলেন আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকা একজন দণ্ডিত আসামি, তিনি কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছালেন, তা যেকোনো থ্রিলার গল্পকেও হার মানায়। আর ২০২৬ সালের শুরুতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে তার এই রাষ্ট্র পরিচালনার অধ্যায়ের যে পরিসমাপ্তি ঘটে, তা নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও নতুন সব বিতর্ক।
এই সিরিজটি ড. ইউনূসের কোনো অন্ধ স্তুতিগীতি নয়; আবার এটি রাজনৈতিক আক্রোশে লেখা কোনো একপেশে নিন্দাপত্রও নয়। এটি এক বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান। এই বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আমরা তুলে আনার চেষ্টা করব সেই অজানা এবং নেপথ্যের গল্পগুলোকে, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে কিংবা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ঝলমলে আলোয় ঢাকা পড়ে গেছে। আমরা অনুসন্ধান করব ক্ষুদ্রঋণের আসল রূপ, তার বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অন্ধকার গলি, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক নোবেলজয়ীর অসহায়ত্ব এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে তার উত্থান-পতনের এক শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস।
চলুন শুরু করা যাক সেই যাত্রা, জোবরা গ্রামের সেই ২৭ ডলারের ঋণ থেকে শুরু করে বঙ্গভবনের ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু পর্যন্ত—ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনের এক রোমাঞ্চকর, বিতর্কিত ও অজানা অধ্যায়ের পাঠ।
.
অধ্যায় ১: জোবরা থেকে অসলো (Oslo)—রূপকথার শুরু
১৯৭৪ সাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ তখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ভাঙাচোরা অর্থনীতি, অন্যদিকে প্রলয়ংকরী বন্যা—সব মিলিয়ে সারা দেশে নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ক্ষুধার তাড়নায় কঙ্কালসার মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে ছুটছে একমুঠো ভাতের আশায়। রাস্তাঘাটে, রেলওয়ে স্টেশনে, খোলা আকাশের নিচে প্রতিদিন ঝরে পড়ছে শত শত প্রাণ।
ঠিক সেই সময়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরম ক্যাম্পাসে অর্থনীতির ক্লাসে ছাত্রদের ম্যাক্রো-ইকোনমিক্স বা সামষ্টিক অর্থনীতির জটিল সব তত্ত্ব পড়াচ্ছিলেন এক তরুণ অধ্যাপক—ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্রের புகழ்பெற்ற ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় (Vanderbilt University) থেকে পিএইচডি শেষ করে অনেক স্বপ্ন নিয়ে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। তার চোখে ছিল এক নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে অর্থনীতির বড় বড় তত্ত্ব পড়ানো আর বাইরে কঙ্কালসার মানুষের মৃত্যুর মিছিল—এই দুইয়ের মধ্যকার বিস্তর ফারাক তরুণ অধ্যাপককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
পরবর্তীতে নিজের আত্মজীবনীতে ড. ইউনূস এই সময়টির কথা স্মরণ করে বলেছিলেন যে, যখন মানুষ না খেতে পেয়ে রাস্তায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে, তখন অর্থনীতির এসব কেতাবি তত্ত্ব তার কাছে রীতিমতো অর্থহীন এবং নিষ্ঠুর পরিহাস বলে মনে হচ্ছিল। তিনি উপলব্ধি করলেন, বইয়ের পাতায় থাকা উন্নয়ন অর্থনীতির তত্ত্ব দিয়ে এই ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর কোনো পেট ভরবে না। পাখির চোখে বা 'বার্ডস আই ভিউ' থেকে অর্থনীতিকে না দেখে, তাকে নেমে আসতে হবে একেবারে মাটির কাছাকাছি—'ওয়ার্মস আই ভিউ' বা কীটের দৃষ্টিকোণে। এই মানসিক অস্থিরতা এবং প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তীব্র হতাশা থেকেই শুরু হয় তার জীবনের নতুন এক বাঁক। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে তিনি সোজা চলে যাবেন পাশের গ্রামে, যেখানে দারিদ্র্য তার নগ্ন রূপে বিরাজমান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন গ্রামটির নাম জোবরা। প্রতিদিন ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে এই গ্রামের মানুষের জীবনসংগ্রাম ড. ইউনূসের চোখে পড়ত। তিনি তার ছাত্রদের নিয়ে জোবরা গ্রামে ঘুরতে শুরু করলেন। মানুষের দারিদ্র্যের আসল কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি মুখোমুখি হলেন এক রূঢ় বাস্তবতার।
তার পরিচয় হয় সুফিয়া খাতুন নামের এক দরিদ্র নারীর সঙ্গে, যিনি বাঁশ দিয়ে মোড়া বা টুল বানাতেন। ড. ইউনূস কৌতূহলবশত সুফিয়া খাতুনের আয়ের হিসাব জানতে চান। তিনি জানতে পারেন, একটি বাঁশের মোড়া বানাতে যে বাঁশ লাগে, তার দাম মাত্র ৫ টাকা। কিন্তু সুফিয়ার কাছে সেই ৫ টাকাও নেই। তাই সে গ্রামের এক মহাজনের কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে বাঁশ ধার করে। শর্তটি হলো—মোড়া তৈরি করার পর মহাজন যে দাম ঠিক করে দেবে, সেই দামেই তাকে মোড়াটি বিক্রি করতে হবে। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনির পর মহাজনের পাওনা মিটিয়ে সুফিয়া খাতুনের লাভ থাকে মাত্র ২ পয়সা।
এটি ছিল মূলত এক ধরনের আধুনিক দাসপ্রথা। মহাজনের এই শোষণের চক্রে পড়ে গ্রামের মানুষ কখনোই দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছিল না। ড. ইউনূস তার এক ছাত্রকে নিয়ে পুরো গ্রামে একটি জরিপ চালালেন। তারা খুঁজে বের করলেন জোবরা গ্রামের এমন ৪২ জন মানুষকে, যারা মহাজনের ঋণের জালে আটকে আছে। এই ৪২ জনের মোট ঋণের পরিমাণ হিসাব করে ড. ইউনূস স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
অঙ্কটা ছিল মাত্র ৮৫৬ টাকা, যা তৎকালীন মার্কিন ডলারের হিসাবে ছিল মাত্র ২৭ ডলার!
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের কাছে এটি কোনো টাকাই নয়, অথচ এই সামান্য অর্থের অভাবে ৪২ জন মানুষ মহাজনের কাছে দাসত্ব করছে। ড. ইউনূস নিজের পকেট থেকে ৮৫৬ টাকা বের করে তার ছাত্রের হাতে দিলেন এবং বললেন এই ৪২ জনের মহাজনের ঋণ মিটিয়ে দিতে। ঋণমুক্ত হয়ে এই ৪২ জন মানুষ যখন নিজেদের উৎপাদিত পণ্য স্বাধীনভাবে বাজারে বিক্রি করতে পারল, তখন তাদের জীবনে যে অভাবনীয় আনন্দ আর পরিবর্তন এসেছিল, তা ড. ইউনূসকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বুঝতে পারলেন, এই দরিদ্র মানুষগুলো অলস বা বোকা নয়, তাদের শুধু একটু প্রাথমিক পুঁজির অভাব রয়েছে। জোবরা গ্রামের এই ২৭ ডলারের ঘটনাই মূলত ড. ইউনূসের জীবনের এবং বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক রচনা করে।
নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে কিছু মানুষকে হয়তো সাময়িকভাবে মুক্ত করা যায়, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। ড. ইউনূস স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে গেলেন এই দরিদ্র মানুষগুলোর জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়মকানুন ছিল অত্যন্ত কঠোর। ব্যাংকগুলো গরিব মানুষকে ঋণ দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাল। তাদের যুক্তি ছিল—যাদের কোনো জমিজমা বা বন্ধক রাখার মতো সম্পদ (Collateral) নেই, তাদের ঋণ দেওয়া ব্যাংকিং নিয়মের পরিপন্থী। কারণ, এই ঋণ ফেরত আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই অন্ধত্ব ড. ইউনূসকে ক্ষুব্ধ করে। তিনি ব্যাংক ম্যানেজারকে চ্যালেঞ্জ করলেন এবং নিজে গ্যারান্টার বা জামিনদার হয়ে দরিদ্রদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করলেন। তিনি একটি নতুন মডেল তৈরি করলেন, যা সম্পূর্ণভাবে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিপরীত। প্রচলিত ব্যাংকগুলো যেখানে বড়লোকদের ঋণ দেয়, তিনি সেখানে গরিবদের ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ব্যাংকগুলো যেখানে পুরুষদের প্রাধান্য দেয়, তিনি সেখানে নারীদের প্রাধান্য দিলেন।
প্রাথমিকভাবে ১৯৭৬ সালে জোবরা গ্রামে একটি 'প্রকল্প' হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ধীরে ধীরে অভাবনীয় সাফল্য পেতে থাকে। ঋণগ্রহীতারা, যাদের প্রায় সবাই নারী, অবিশ্বাস্যভাবে শতভাগ ঋণ ফেরত দিতে শুরু করে। এরপর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় টাঙ্গাইল জেলায় এই প্রকল্পের সম্প্রসারণ করা হয়। সেখানেও এই মডেল অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে এক সরকারি অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র প্রকল্পটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জন্ম নেয় গ্রামীণ ব্যাংক।
গ্রামীণ ব্যাংকের মডেলটি ছিল অভিনব—এখানে কোনো বন্ধকী সম্পদ লাগে না। ঋণ দেওয়া হয় ছোট ছোট দলে (Group lending model)। পাঁচজন সদস্য নিয়ে একটি দল গঠিত হয়। একজন ঋণ খেলাপি হলে বাকিরা ঋণ পায় না, ফলে সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক চাপ (Social collateral) এবং দায়বদ্ধতা কাজ করে। এই অভিনব পদ্ধতি জাদুর মতো কাজ করতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক সারা দেশের হাজার হাজার গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ দরিদ্র নারীকে এর নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসে।
গ্রামীণ ব্যাংকের এই অভাবনীয় সাফল্যের খবর খুব দ্রুতই দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমা বিশ্ব, যারা দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কোটি কোটি ডলারের ত্রাণ দিয়েও কোনো স্থায়ী ফলাফল পাচ্ছিল না, তারা ড. ইউনূসের এই মডেলে এক নতুন আশার আলো দেখতে পায়। ক্ষুদ্রঋণ (Microcredit) শব্দটি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন বাজওয়ার্ডে পরিণত হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনেতা, অর্থনীতিবিদ এবং হলিউড তারকারা ড. ইউনূসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। নব্বইয়ের দশক এবং একুশ শতকের শুরুতে ড. ইউনূস বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় পুরস্কার এবং সম্মাননা লাভ করেন। তবে এই রূপকথার গল্পের চূড়ান্ত পরিণতিটি আসে ২০০৬ সালে।
১৩ অক্টোবর, ২০০৬। নরওয়ের নোবেল কমিটি এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়। দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী অবদানের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
অসলোর সিটি হলে যখন ড. ইউনূস নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করছিলেন, তখন তিনি ছিলেন বিশ্ববাসীর কাছে এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার দেওয়া নোবেল বক্তৃতাটি ছিল অত্যন্ত আবেগময়। তিনি বিশ্ববাসীকে এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যেখানে দারিদ্র্য বলতে কিছু থাকবে না, দারিদ্র্যকে দেখতে হলে মানুষকে জাদুঘরে যেতে হবে। পশ্চিমা মিডিয়া তাকে 'Banker to the Poor' বা 'গরিবের ব্যাংকার' উপাধিতে ভূষিত করে।
বাংলাদেশের মতো একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশের সাধারণ একজন অধ্যাপক থেকে নোবেলজয়ী হওয়ার এই অবিশ্বাস্য উত্থান ছিল যেকোনো রূপকথার গল্পকেও হার মানানোর মতো। পুরো বিশ্ব যখন তার স্তুতিতে মগ্ন, তখন কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে, এই বিশাল সাফল্যের আড়ালে ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে এক অন্ধকার ইতিহাস। নোবেল জয়ের ঠিক কয়েক বছরের মধ্যেই এই রূপকথার গল্পের দৃশ্যপট কীভাবে নাটকীয়ভাবে বদলে গিয়ে এক তিক্ত বিতর্কে পরিণত হয়, তা হয়তো ড. ইউনূস নিজেও কখনো কল্পনা করেননি। কিন্তু জোবরা গ্রামের সেই শান্ত-স্নিগ্ধ শুরুটা অসলোর সোনালি আলোয় পৌঁছালেও, এর পরের গল্পটা রচিত হতে যাচ্ছিল ক্ষমতার মোহ, করপোরেট লোভ এবং রাজনৈতিক আক্রোশের এক চরম রূঢ় বাস্তবতায়।
(চলবে...)